২১ জানুয়ারী ২০১৯


হোম   »   কৃষি তথ্য   »   ফল-মূল চাষ  
আমে পোকা দমনের উপায়

পোকামাকড়ের ব্যাপক আক্রমণের ফলে শতকরা একশ’ ভাগ পর্যন্ত আম নষ্ট হতে পারে। ল্যাংড়া, খিরসাপাত, ফজলিসহ বিভিন্ন জাতের আম মাছি পোকা দ্বারা আক্রান্ত হয়। আম পরিপকস্ফ হলে স্ত্রী মাছি ডিমপাড়া অঙ্গের সাহায্যে আমের খোসা ক্ষত করে ডিম পাড়ে। এ ক্ষতস্থান থেকে রস গড়িয়ে পড়ার দাগ দেখে এ পোকার আক্রমণ সহজে বোঝা যায়। ডিম থেকে এক সপ্তাহের মধ্যেই কীড়া বা ম্যাগোট বের হয় এবং শাঁসের মধ্যে ঢুকে পড়ে। আক্রান্ত পাকা আম কাটলে শাঁসের সঙ্গে অনেকগুলো কীড়া বা ম্যাগোট দেখা যায়। আক্রান্ত আম অতি সহজেই পচে যাওয়ার সম্ভবনা থকে।

মাছি পোকার আক্রমণ থেকে আমকে রক্ষা করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো পরিপকস্ফ কিন্তু কাঁচা অবস্থায় গাছ থেকে আম পেড়ে আনা। পোকাক্রান্ত আমগুলো সংগ্রহপূর্বক মাটিতে গভীর গর্ত করে পুঁতে ফেলতে হবে। ফল সংগ্রহের অন্তত এক মাস আগে বিষটোপ ফাঁদ ১০০ গ্রাম পাকা আম থেঁতলিয়ে এর সঙ্গে ১ গ্রাম ডিপটেরেক্স ৮০ এসপি বা সেকুফোন ৮০ এসপি বিষ মিশিয়ে মাটির পাত্রে আম বহনকারী শাখার পাশে ঝুলিয়ে দিতে হবে। বিষটোপ দু’দিন পরপর পরিবর্তন করা প্রয়োজন। ফেরোমন ফাঁদ (মিথাইল ইজানল যুক্ত) ব্যবহার করা। ফল সংগ্রহের একমাস আগে প্রতিটি আমকে কাগজের ব্যাগ দিয়ে মুড়িয়ে দিলে আমে মাছি পোকার আক্রমণ সম্পূর্ণভাবে রোধ করা যায়।

উইভিল আমের সবচেয়ে ক্ষতিকর পোকা। বীজ থেকে জন্মানো আমগাছের ফলই এ পোকার দ্বারা সর্বাধিক আক্রান্ত হয়ে থাকে। স্ত্রী পোকা মার্চ-এপ্রিল মাসে কাঁচা আমের গায়ে মুখের শুঁড়ের সাহায্যে চিরে তার মধ্যে ২ থেকে ৭টি ডিম পাড়ে। ফল বড় হতে থাকলে এ ক্ষতচিহ্ন আস্তে আস্তে উবে যায়। সাত দিনের মধ্যে ডিম ফুটে পা-বিহীন কীড়া বের হয় এবং কীড়াগুলো ফলের শাঁসের মধ্যে আঁকাবাঁকা সুড়ঙ্গ তৈরি করে খেতে থাকে। আক্রান্ত ফল কাটলে শাঁসে কীড়ার তৈরি আঁকাবাঁকা সুড়ঙ্গ, সুড়ঙ্গে কীড়া দ্বারা নির্গত কালো রঙের মল এবং পোকার কীড়া বা পুত্তলি বা পূর্ণবয়স্ক পোকা দেখা যায়। পূর্ণবয়স্ক পোকা ফল ছিদ্র করে বের হয়ে আসে।

ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতিটি আমগাছের চারদিকে ৪ মিটার ব্যাসার্ধের বৃত্তের মধ্যে সব আগাছা পরিষ্কার করে ভালোভাবে মাটি কুপিয়ে উল্টে দিতে হবে, যাতে মাটির ভেতর লুকিয়ে থাকা উইভিলগুলো ধ্বংস হয়। আম সংগ্রহের পর গাছের সব পরগাছা ও পরজীবী উদ্ভিদ ধ্বংস করতে হবে। কীটনাশক প্রয়োগ করে এ পোকা দমন করা খুবই ব্যয়সাধ্য। সাধারণত মার্চ-এপ্রিল মাসে উইভিলগুলো মাটি থেকে গাছে ওঠা শুরু করে। এসময় প্রতি লিটার পানিতে ২.০ মিলিলিটার হারে ফেনিট্রোথিয়ন (সুমিথিয়ন/অন্য নামের) ৫০ ইসি মিশিয়ে গাছের কাণ্ড, ডাল ও পাতা ভালোভাবে ভিজিয়ে ১৫ দিন অন্তর একাধিকবার স্প্রে করতে হবে। আমগাছের কাণ্ডে মাজরা পোকার আক্রমণ সর্বত্রই কমবেশি দেখা যায়। ফল ছিদ্রকারী এ পোকাটি লেপিডোপটেরা গোত্রের অন্তর্ভুক্ত এক ধরনের মথ। পূর্ণবয়স্ক পোকা লম্বায় প্রায় ১৪ মিলিমিটার, ধূসর বর্ণের, পাখা আঁশযুক্ত।

ফল ছিদ্রকারী পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী পোকা আমের নিচের অংশে খোসার ওপর ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে লার্ভা বের হয়ে খুব ছোট বিন্দুর মতো ছিদ্র করে আমের মধ্যে ঢুকে পড়ে এবং প্রথমে শাঁস ও পরে আঁটি খাওয়া শুরু করে। প্রাথমিক অবস্থায় আক্রান্ত স্থান গাঢ় বাদামি বর্ণের হয় এবং ছিদ্রপথ থেকে সাদা ফেনা বের হতে দেখা যায়। পরে ফেনাসহ আক্রান্ত স্থান শুকিয়ে কালো হয়ে যায়। গাছের নিচ থেকেই এ পোকার আক্রমণের নমুনা সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়। আক্রমণের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেলে আক্রান্ত স্থান ফেটে যায় ও পচন ধরে। মার্চ-এপ্রিল মাসে ঝরে যাওয়া আক্রান্ত কচি ফল মাটি থেকে সংগ্রহ করে আগুনে পুড়ে ফেলতে হবে অথবা গরুকে খাওয়ানো যেতে পারে। ফলে নতুন করে আক্রমণ কম হবে। মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু করে ১৫ দিন পর পর কমপক্ষে দু’বার প্রতি লিটার পানির সঙ্গে ২.০ মিলিলিটার হারে ফেনিট্রোথিয়ন (সুমিথিয়ন/অন্য নামের) ৫০ ইসি মিশিয়ে আমে স্প্রে করলে এ পোকার আক্রমণ কমানো সম্ভব হবে।

কোনো কোনো অঞ্চলের আমগাছে হঠাত্ করে পাতাখেকো শুঁয়া পোকার আক্রমণ দেখা যায়। পাতাখেকো শুঁয়া পোকা আমগাছের পাতার ফলক সম্পূর্ণভাবে খেয়ে শুধু মধ্যশিরাটি রাখে। এ পোকার আক্রমণে আমগাছ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে পাতাশূন্য হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় আক্রান্ত আমগাছে অসময়ে নতুন পাতা বের হয় এবং মুকুল আসে না।

পূর্ণতাপ্রাপ্ত শুঁয়া পোকা কীটনাশক প্রয়োগে মারা খুব কঠিন বিধায় আমগাছে শুঁয়া পোকার ছোট ছোট কীড়া দেখামাত্র সেগুলো পাতাসহ সংগ্রহ করে পা দিয়ে পিষে মেরে ফেলতে হবে কিংবা সে অবস্থায় পাতায় প্রতি লিটার পানির সঙ্গে ২.০ মিলিলিটার হারে ফেনিট্রোথিয়ন (সুমিথিয়ন/অন্য নামের) ৫০ ইসি মিশিয়ে স্প্রে করলে এ পোকার আক্রমণ কমানো সম্ভব হবে।

হপার বা শোষক পোকার আক্রমণে আমের উত্পাদন শতকরা ২০ থেকে ১০০ ভাগ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। তিনটি প্রজাতির হপারের আক্রমণে বাংলাদেশের সর্বত্র আমের ফলন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এ পোকাগুলো সাধারণত তিনভাবে ক্ষতি করে থাকে। প্রথমত, কচি পাতা এবং মুকুলের দণ্ডগুলোতে ডিম পাড়ার সময় ক্ষতের সৃষ্টি হয়। ফলে আক্রান্ত পাতা ও ফুল শুকিয়ে ঝরে যায়। দ্বিতীয়ত, ডিম ফুটে নিমম্ফ বের হওয়ার পর এরা কচি পাতা এবং মুকুল থেকে রস চুষে খায়, ফলে মুকুলে ফুল শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে ঝরে যায়।

পূর্ণবয়স্ক আম গাছে বর্ষা মৌসুমের শেষে বছরে একবার অপ্রয়োজনীয় মৃত ও অর্ধমৃত ডালাপালা ছাঁটাই করে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করলে হপারের প্রাদুর্ভাব ৩০-৪০ শতাংশ কমে যায়। আমগাছে মুকুল আসার ১০ দিনের মধ্যে একবার এবং এর এক মাস পর আরেকবার প্রতিলিটার পানির সঙ্গে ১.০ মিলিলিটার সাইপারমেথ্রিন (রিপকর্ড/সিমবুশ/ফেনম/বাসাথ্রিন/অন্য নামের) ১০ ইসি অথবা ০.৫ মিলিলিটার ডেলটামেথ্রিন (ডেসিস) ২.৫ ইসি অথবা ০.৫ মিলিলিটার ফেনভ্যালিরেট (সুমিসাইডিন/মিলফোন/অন্য নামের) ২০ ইসি মিশিয়ে আমগাছের কাণ্ড, ডাল, পাতা এবং মুকুল ভালোভাবে ভিজিয়ে স্প্রে করে আমের হপার দমন করা সম্ভব।
পাতাটি ৩৫৫৮ প্রদর্শিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ

»  পুষ্টিকর ফল বিলাতি গাব ও অরবরই চাষ

»  সফেদা চাষ

»  বাংলাদেশের কৃষিতে এবার ড্রাগন ফল

»  আনারস চাষ

»  আমের যখন মুকুল ঝরে