Deprecated: mysql_connect(): The mysql extension is deprecated and will be removed in the future: use mysqli or PDO instead in /home/sumon09/public_html/include/config.php on line 2
 ফসলের জন্য জৈব-রাসায়নিক সার

২১ জুলাই ২০১৮


হোম   »   কৃষি তথ্য   »   সার বিষয়ক তথ্য  
ফসলের জন্য জৈব-রাসায়নিক সার


সত্তর দশকের গোড়ার কথা। দক্ষিণ আফিন্সকার একটি সার কোম্পানি (গ্রোইক্রাগ অর্গানিক ফার্টিলাইজার্স কোং) একধরনের যৌগিক জৈব সারের উৎপাদন শুরু করে, যার উপাদান ছিল গুয়ানো ও অ্যামোনিয়াম কার্বনেট। সেটাই ছিল প্রথম তৈরি করা জৈব-রাসায়নিক সার। ধীরে ধীরে দক্ষিণ আফিন্সকার কৃষকরা ব্যাপকভাবে সেই সার ব্যবহার করতে শুরু করেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ডিকারসন কম্পোস্টিং প্লান্ট স্লাজ স্লারির সাথে কাঠের কুচি, চুন ও রক ফসফেট মিশিয়ে এক ধরনের জৈব-রাসায়নিক সার তৈরি করে। কিন্তু তাদের উৎপাদন খরচ বেশি পড়ায় কোম্পানি লোকসানের মুখে পড়ে। ১৯৮২ সালে প্রতি এক লাখ মেট্রিক টন সার উৎপাদনে তাদের লোকসানের পরিমাণ ছিল প্রায় সাত মিলিয়ন ইউএস ডলার।

তবে এখন আর সেই অবস্খা নেই। অনেক দেশেই বিভিন্ন সার কোম্পানি এখন শুধু জৈবসার উৎপাদন না করে জৈব সারের সাথে পরিমাণ মতো বিভিন্ন রাসায়নিক সার যোগ করে এক নতুন ধরনের সার তৈরিতে লেগে পড়েছেন। এসব সারকে বলা হচ্ছে জৈব-রাসায়নিক সার বা অর্গানিক কম্পাউন্ড ফার্টিলাইজার। এটি আসলে উন্নত মানের কম্পোস্ট ও রাসায়নিক সারের সংমিশ্রণ, যা বেশ ব্যয় সাশ্রয়ী ও পরিবেশ দূষণ হন্সাসকারী। ফলে বিশ্বের নানা দেশে এখন জৈব-রাসায়নিক সারের কদর বাড়ছে। এক দিকে মাটির উর্বরতা রক্ষা, অন্য দিকে যে ফসলের জন্য যে পুষ্টি উপাদান যে অনুপাতে যতটুকু দরকার তা নিশ্চিত করার কারণে কৃষকদের কাছে জৈব-রাসায়নিক সারের চাহিদা বাড়ছে। এ জন্য এ ফর্মুলেশনের দিকে এখন অনেক সার কোম্পানি ঝুঁকে পড়েছে। এমনকি এ দেশেও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান এখন জৈবসারের লেবেলে তার সাথে অল্পস্বল্প রাসায়নিক সার মিশিয়ে বাজারজাত করছে।

যুক্তরাষ্ট্রে এখন অনেক কম্পোস্ট প্লান্ট পোলট্রি বর্জ্য, ভুট্টার উচ্ছিষ্ট, মাশরুমের বর্জ্য, গোবর, ফসলের অবশিষ্টাংশ, নর্দমার আবর্জনা ইত্যাদি পচিয়ে কম্পোস্ট তৈরি করে তার সাথে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম যোগ করে জৈব-রাসায়নিক সার উৎপাদন করছে। প্রতি টন শুধু কম্পোস্ট সার যেখানে বিক্রি হয় ২৫-৩০ ইউএস ডলার, সেখানে কম্পোস্টের সাথে যোগ করা রাসায়নিক পুষ্টি উপাদানসমৃদ্ধ জৈব-রাসায়নিক সার বিক্রি হয় ৩১-৫০ ইউএস ডলার। এরূপ সারকে তারা বলছে ‘কম্পোস্ট-এনপিকে প্লাস’ বা অর্গানিক কম্পাউন্ড ফার্টিলাইজার।

তাইওয়ান ফার্টিলাইজার কোম্পানি ১৯৮৬ সাল থেকে জৈব-রাসায়নিক সার উৎপাদন করে আসছে। এ পর্যন্ত তারা সাতটি ফর্মুলেটেড জৈব-রাসায়নিক সার বাজারজাত করেছে। এক-এক ফর্মুলেশন এক-এক ধরনের ফসলে ব্যবহারের জন্য উপযোগী। তারা প্রতি টন জৈব-রাসায়নিক বিক্রি করছে ৩২৬-৫৪৪ ইউএস ডলারে, যা ওই দেশে উৎপাদিত কম্পোস্টের দামের চেয়ে প্রায় ৩০-১০০ শতাংশ বেশি। এক-এক ফসলের পুষ্টি চাহিদা এক-এক রকম। তাই সে বিষয়টি মাথায় রেখে বিভিন্ন ফর্মুলেশনের জৈব-রাসায়নিক সার তৈরি করা হয়। জৈব-রাসায়নিক সার তৈরির প্রধান উদ্দেশ্য হলো, জমিতে জৈবসারের খরচ কমানো। কেননা কম্পোস্টের তুলনায় জৈব-রাসায়নিক সার পরিমাণে বেশ কম লাগে। এ ছাড়া নাইট্রোজেন ঘটিত রাসায়নিক সারের মাধ্যমে যে নাইট্রেট দূষণ হয় তা এ সার ব্যবহারে অনেক কমে যায়। শুধু জৈব সার ব্যবহারে যে ফলন পাওয়া যায় তার তুলনায় জৈব-রাসায়নিক সার ব্যবহারে ফলন বেশি হয়, এর প্রতি ফসল সাড়াও দেয় ভালো। এসব সুবিধা ও লাভের কথা বিবেচনা করে তাইওয়ানে এখন দিন দিন জৈব-রাসায়নিক সার তৈরির কারখানা বাড়ছে। দেশটিতে এখন প্রায় ১০০টি বেসরকারি কোম্পানি জৈব সার উৎপাদনে জড়িত রয়েছে। যদিও সেসব কোম্পানির গুণগত মান সবার ভালো নয় এবং সেসব সার বেশ চড়া দামেই তারা বিক্রি করছে, তবুও তারা দেশটিতে জৈব-রাসায়নিক সার উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
তাইওয়ান ফার্টিলাইজার কোম্পানির একটি উল্লেখযোগ্য জৈব-রাসায়নিক সারের নাম ‘টিএফসি স্পেশাল নম্বর ৪’। এতে বিভিন্ন উপাদানের অনুপাত হলো ৮-৮-৮-৩-৫০। অর্থাৎ এতে আছে নাইট্রোজেন ৮, ফসফরাস ৮, পটাশিয়াম ৮, ম্যাগনেশিয়াম ৩ ও কম্পোস্ট ৫০ অনুপাতে।

কম্পোস্টের কাঁচামাল হিসেবে পিট মাটি ও গুয়ানো বা পশুমল এবং রাসায়নিক পুষ্টি উপাদান হিসেবে ইউরিয়া, মনো-অ্যামোনিয়াম ফসফেট, পটাশিয়াম সালফেট, পটাশিয়াম হাইড্রোক্সাইড, ম্যাগনেশিয়াম হাইড্রোক্সাইড। এতে প্রায় ৫০ শতাংশ জৈব পদার্থ রয়েছে। এর অম্লমান বা পিএইচ প্রায় ৭। গুঁড়া ও দানাদার উভয় আকারেই এটা বিক্রি হয়। ধান, সবজি, চা, ফুল ও অন্যান্য উদ্যান ফসলের জন্য এই জৈব-রাসায়নিক সারটি ব্যবহার করা যায় বলে তারা উল্লেখ করেছে।

এ ছাড়া বিশ্বে আরো অনেক কোম্পানি অনেক রকমের জৈব-রাসায়নিক সার বাজারে ছেড়েছে। তবে দামের বিবেচনায় সব সার সব ফসলে ব্যবহার লাভজনক নয়। যেমন­ ভুট্টা ফসলে জৈব-রাসায়নিক সার দেয়ার চেয়ে শুধু রাসায়নিক সার দিয়ে উৎপাদন করা লাভজনক। যদিও দক্ষিণ আফিন্সকায় এক গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু রাসায়নিক সার দেয়ার চেয়ে জৈব-রাসায়নিক সার দিলে ভুট্টা ও তামাকের ফলন ২০-৪০ শতাংশ বাড়ে, তথাপি তা লাভজনক নয়। তেমনি লাভজনক নয় ধান ফসলের জন্য। তবে চা ফসলে গবেষণা করে দেখা গেছে, জৈব-রাসায়নিক সার প্রয়োগে চায়ের গìধ ও স্বাদ বাড়ে। অন্য দেশে জৈব-রাসায়নিক সারের মূল্য জৈব কিংবা রাসায়নিক সারের চেয়ে অনেক বেশি বলেই হয়তো এসব ফসলে তা ব্যবহার লাভজনক বলে প্রমাণিত হয়নি। তাই বলে এ দেশে হবে না এমন কোনো মানে নেই। এ বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ আছে।
তবে যা-ই হোক, টেকসই ফসল উৎপাদনের জন্য এখন আর শুধু রাসায়নিক সার ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে থাকা যাচ্ছে না। আবার অন্য দিকে শুধু জৈব সার প্রয়োগে ফসল উৎপাদন করে বর্ধিত জনগোষ্ঠীর বিপুল পরিমাণ খাদ্য চাহিদা পূরণ করা কঠিন। তা ছাড়া যেকোনো জমিতে শুধু জৈব সার প্রয়োগ করতে গেলে যে বিপুল পরিমাণ সার লাগে তা উৎপাদনও সহজ নয়। এর সাথে আছে কাঁচামালের দুষ্প্র্রাপ্যতা, পরিবহন ও অধিক শ্রমিক ব্যয়। আছে ফসলের চাহিদামাফিক সব পুষ্টির জোগান নিশ্চিত করার ঝুঁকি। যদিও শুধু জৈবসার প্রয়োগে মাটির উর্বরতা ও ফসলের গুণগত মান ভালো হয় তথাপি অধিক ফলনের বিষয়টিও উপেক্ষা করার নয়।

তাই টেকসই ফলন বৃদ্ধি ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য সমন্বিত উদ্ভিদ পুষ্টি ব্যবস্খাপনার কোনো বিকল্প নেই। সেটি হলো জৈব ও রাসায়নিক সারের সমন্বয়ে ফসল উৎপাদন। এ ক্ষেত্রে জৈব-রাসায়নিক সার সহায়ক হতে পারে। তবে এ দেশে তার উৎপাদন, বিপণন ও মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। গবেষকদের ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্যাটেন্ট উন্নয়নে দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের প্রয়োজন রয়েছে। এসব না হলে লাভের বদলে লোকসান বাড়বে, ঠকবে দেশের কৃষক ও কৃষি। লাভবান হবে উৎপাদক কোম্পানিরা।

লেখক: মৃত্যুঞ্জয় রায়
পাতাটি ৩৩৭১ প্রদর্শিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ

»  ফসলের জন্য কেঁচো সার

»  ইউরিয়া সার ব্যবহার করে খড় সংরক্ষণ

»  ফসলের জন্য জৈব-রাসায়নিক সার

»  পরিবেশবান্ধব সবুজ সার

»  লবণাক্ত ধানী জমিতে সারব্যবস্থাপনা