Deprecated: mysql_connect(): The mysql extension is deprecated and will be removed in the future: use mysqli or PDO instead in /home/sumon09/public_html/include/config.php on line 2
 স্ট্রবেরি গাছে গোড়াপচা রোগ ও করনীয়

২১ জুলাই ২০১৮


হোম   »   কৃষি তথ্য   »   রোগবালাই ও প্রতিকার  
স্ট্রবেরি গাছে গোড়াপচা রোগ ও করনীয়

লতানো গাছে ঝুলে আছে লাল টকটকে ফল। মনকাড়া এ ফলটি দেখলে কার না খেতে মন চায়। দক্ষিণ আমেরিকার ভার্জিনিয়া, ইউরোপের চিলিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘুরে বাঙালির মনও জয় করেছে ওই ফলটি। নাম তার স্ট্রবেরি। ১৯৯৬ সালে স্ট্রবেরির আগমন ঘটে বাংলাদেশে এবং ২০০৭ সাল থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে শুরু হয়েছে এর চাষ। ইতিমধ্যে সারাদেশের প্রায় সব জেলায় এর চাষ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের আবহাওয়ায় ফলটির খাপ খাবে কিনা চিন্তা করা হয়নি একবারও। এ বছর সারাদেশে চাষকৃত প্রায় ৮৫ শতাংশ স্ট্রবেরি গাছ মড়ক লেগে মারা গেছে। টাকার অঙ্কে যার ক্ষতির পরিমাণ হেক্টরে ৪৫ লাখ। বিশেষজ্ঞরা এটাকে টিস্যু কালচার পদ্ধতির ত্রুটির কথা উল্লেখ করেছেন। খোদ উদ্ভাবক এটাকে স্বীকার করে নিয়ে বাংলাদেশের আবহাওয়ায় স্ট্রবেরি কতটা খাপ খাচ্ছে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।

ঠিক কি কারণে গাছগুলো মারা যাচ্ছে তা উদ্ভাবকসহ কারো কাছে এতদিন বোধগম্য ছিল না। তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্লান্ট ডিজিজ ডায়াগনস্টিক ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞরা স্ট্রবেরির মড়ক লাগার কারণ নির্ণয় করেছেন এবং তা প্রতিকারের পথও খুঁজে পেয়েছেন। যা ইতিমধ্যে মাঠপর্যায়ে ব্যবহার করে কৃষকরা সুফল পেয়েছেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্লান্ট ডিজিজ ডায়াগনস্টিক ক্লিনিকের পরিচালক অধ্যাপক ড. এম বাহাদুর মিঞা এবং অধ্যাপক ড. মো. দেলোয়ার হোসেন সংবাদ সম্মেলনে জানান, এ বছরে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে সারাদেশের বিভিন্ন জেলায় রোপণ করা হয় স্ট্রবেরি ফলের চারা। রোপণের কিছুদিন পর থেকেই দেখা দেয় অজ্ঞাত এক রোগ। বিগত এক মাস ধরে এ রোগটি ব্যাপক আকারে দেশের চাষকৃত বিভিন্ন স্ট্রবেরির বাগানে ছড়িয়ে পড়ে। সারাদেশে চাষকৃত স্ট্রবেরির ৬০ থেকে ৮৫ ভাগ ইতিমধ্যে এ রোগে আক্রান্ত হয়। সঠিক নির্দেশনার অভাবে বাকি চারাতেও এ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। চাষকৃত কৃষকরা প্রতি হেক্টরে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।

এই রোগটিকে প্রথমে শনাক্ত ও প্রতিকারের জন্য বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এর নমুনা নিয়ে আসেন লালমনিরহাটের প্লান্ট বাংলাদেশ নার্সারি থেকে কৃষিবিদ মো. সেলিম। উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের এই ক্লিনিকে রোগটি শনাক্ত ও এর প্রতিকারের উপায় অনুসন্ধান করেন। প্রত্যক্ষভাবে রংপুর, লালমনিরহাট, হাতিবান্ধা, কালিগঞ্জের বিভিন্ন নার্সারিতে এই রোগটি পর্যবেক্ষণ করেন এবং নমুনা সংগ্রহ করে আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। এতে দেখা যায় আক্রান্ত গাছের ক্রাউন/গোঁড়া অংশে টানলে/কাটলে কমলা লাল থেকে গাঢ় বাদামি লাল রঙ দেখা যায় এবং আক্রান্ত অংশ থেকে কিছুটা দুর্গন্ধ বের হয়। দেখা গেছে এক ধরনের জীবাণু স্ট্রবেরি গাছের ক্রাউনের এক প্রান্ত থেকে আক্রমণ শুরু করে যা গাছের ওপর থেকে বোঝা যায় না। তারপর ক্রমান্বয়ে গাছের ক্রাউন অংশ পচে গেলে গাছটি হঠাৎ করে ঢলে পড়ে এবং পাতা হলুদ বা বাদামি হয়ে যায়। রোগটি প্রধানত চযুঃড়ঢ়যঃযড়ৎধ পধপঃড়ৎঁস দিয়ে সংগঠিত হচ্ছে। তবে ২/১ জায়গায় Phytophthora এবং Fusarium- এর উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। এসব বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা এটিকে অভিহিত করেছেন Crown rot গোড়াপচা রোগ।

ড. বাহাদুর মিঞা জানান, এ পর্যন্ত রংপুরের ঈশ্বরপুরে প্রায় ৮৫ ভাগ, হাতিবান্ধায় ৬০ ভাগ, কালিগঞ্জে ৪০ ভাগ, মুক্তাগাছায় ৫০ ভাগ এবং রাজশাহীতে ৬৬ ভাগ স্ট্রবেরি গাছ এ রোগে মারা গেছে। টিস্যু কালচার করার সময় সব ধরনের সতর্কতা সঠিকভাবে অবলম্বন করা হয়নি, কাজেই ওই উৎস থেকেই এ রোগ ছড়াচ্ছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

লালমনিরহাটের কালিগঞ্জ উপজেলার গোপাল রায় গ্রামের হক নাসারির স্বত্বাধিকারী নুরুল হক জানান, ৫০ শতক জায়গায় ৬ হাজার স্ট্রবেরি গাছ রোপণ করেছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মঞ্জুর মোর্শেদের কাছ থেকে প্রতি চারা ১৫ টাকা দরে ক্রয় করেন। কিন্তু ইতিমধ্যে তার প্রায় ৮৫ ভাগ চারা মারা গেছে। সাধারণত ১টি স্ট্রবেরি গাছ থেকে ২৫০-৫০০ গ্রাম স্ট্রবেরি ফল বিক্রি করা যায়। প্রতি কেজির মূল্য ৮০০-১২০০ টাকা। গড়ে গাছ প্রতি ২৫০ ফল এবং এক হাজার টাকা কেজি দাম বিবেচনা করলে আমার এ বছর হেক্টরে ক্ষতি হয়েছে ৪৫ লাখ টাকা। এছাড়া কুষ্টিয়ার কামরুজ্জামান, মুক্তাগাছার নূর হোসেন, হাতিবান্ধার গোছর আলী একই অভিযোগ করে বলেন, গত বছর তাদের স্ট্রবেরিতে কোনো সমস্যা হয়নি। তবে এ বছর তারা আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন।
রংপুর সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা আলী আজম বলেন, সদরের চন্দর পাঠ ইউনিয়নের ঈশ্বরপুর গ্রামের একটি স্ট্রবেরি খামারে প্রায় ৯০ ভাগ গাছ মারা গেছে। আমরা কোনো প্রতিকার খুঁজে পাচ্ছি না। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে জানেন এ মড়কের জন্য চারার উৎসই দায়ী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মঞ্জুর মোর্শেদের টিস্যু কালচার পদ্ধতির ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে এমনটি হয়েছে। তিনি চারা তৈরির পর এগুলোকে লাল মাটিতে রাখেন। যেখানে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। তাছাড়া লাল মাটি অনেক শক্ত হওয়ার কারণে চারা গাছের মূল শিকড় বড় হতে পারে না। ফলে এগুলোকে জমিতে লাগানোর পর মারা যায়। তিনি বাংলাদেশের আবহাওয়ায় এটা কতটা উপযোগী সে ব্যাপারেও প্রশ্ন তোলেন।

পরীক্ষামূলকভাবে নির্বাচন পদ্ধতিতে রাবি-১, রাবি-২ এবং রাবি-৩ নামে তিনটি স্ট্রবেরি জাত ২০০৭ সালে উদ্ভাবন করা হয়। পরে ওই বছরই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে স্ট্রবেরি চাষ শুরু হয়। এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ চারা টিস্যু কালচার গবেষণাগার থেকে বিক্রি করেন। তাছাড়া কৃষকরা মাতৃগাছ থেকে আরো লাখ লাখ চারা উৎপাদন করে এ বছর চাষ করেছেন।

কৃষকদের স্ট্রবেরি চারায় মড়ক সম্পর্কে বলেন, ব্যাপারটি সত্য। আমরা শুনছি গাছ লাল হয়ে যাচ্ছে। পরে হঠাৎ কা- ভেঙে মারা যাচ্ছে। এজন্য আমরা কৃষকদের Ruvral, Bavistin, Cupravit, Tilt, Secme, Volkan, Antachlor, Haynaxy, Gilzim ইত্যাদি ছত্রাকনাশক ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছি। সত্যি বলতে রোগের নামটাই ধরতে পারছি না। সেহেতু, কাজেই সঠিক প্রতিকার দিতে পারছি না। কৃষকরাও কোনো সুফল পাচ্ছে না। রংপুরের সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তার অভিযোগ স্বীকার করে বলেন, মনে হচ্ছে ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি আছে। এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে জাপান থেকে বিশেষজ্ঞ নিয়ে এসেছি। বাংলাদেশে ফলটি নতুন, তাই খাপ খেতে সমস্যা হচ্ছে। এখানে ভাবনার বিষয় হচ্ছে, আমার তৈরি করা চারায় নাকি কৃষকদের কাটিং করা চারায় এ সমস্যা হচ্ছে তা খতিয়ে দেখা দরকার। ড. মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, মাটির পিএইচ এর তারতম্যের কারণেও এমনটি হতে পারে।

ড. বাহাদুর মিঞা বলেন, বাংলাদেশে স্ট্রবেরি চাষের যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে তা নিঃসন্দেহে দেশের অর্থনীতিকে বেগবান করতে সহয়তা করবে। তবে এ ব্যাপারে বিস্তর গবেষণা করে মাঠপর্যায়ে নিয়ে গেলে ভালো হতো।

এই রোগটি প্রতিকারের জন্য প্রথমে সেপানীল ০.১ ভাগ্র করতে হবে। সেপানীল প্রয়োগের দুদিন পর ১ মন ছাই, ১ কেজি পটাশ সার, ১/২ কেজি রিডোমিল মিশিয়ে গাছের গোড়ায় ১ মুঠো করে দিতে হবে। তবে এর সঙ্গে আইপিএম ল্যাব, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক উদ্ভাবিত Trichoderma বায়োপেস্টিসাইড প্রতি গাছের গোড়ায় ১০ গ্রাম করে দিলেও প্রতিকার পাওয়া যাবে। বর্তমানে মুক্তাগাছা, হাতিবান্ধা এবং কালিগঞ্জের নার্সারিতে এই ব্যবস্থাপনার দ্বারা রোগাক্রান্ত জমিকে প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে। লালমনিরহাটের নুরুল হকও বলেন, প্লান্ট ডিজিজ ডায়াগনস্টিক ক্লিনিকের এ প্রতিকার পদ্ধতি প্রয়োগ করে তিনি সুফল পাচ্ছেন।

লেখক: মো. শাহীন আলম
পাতাটি ২৩০১ প্রদর্শিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ

»  শসা ও তেঁতুল পাতার বালাইনাশক

»  লিচু ফেটে যাওয়ার কারন ও তার প্রতিকার

»  লিচুর রোগ প্রতিকার ও সার ব্যবস্থাপনা

»  আমের ক্ষতিকর পোকামাকড় ও রোগবালাই

»  স্ট্রবেরি গাছে গোড়াপচা রোগ ও করনীয়